করোনা প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা-সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত জরুরি

খান মোহাম্মদ ফজলুল বারী ইভান : করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাসের আক্রমণে সমগ্র বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিল ৫০,০০০ ছাড়িয়ে… আর বিশ্বে ১০,০০০ ০০ এর উপরে করোনা আক্রান্ত। মৃত্যুর ভয় ও অজানা তথ্যের জন্য মানুষ দিশেহারা! সমগ্র মানব জাতি যুদ্ধ করছে অদৃশ্য এই করোনা ভাইরাসের সাথে। তবে এতে ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক না কেন আশাকরি আমরা অবশেষে জয়ী হবো মানবজাতি।

কারণ, মানুষ সেই জন্মলগ্ন থেকেই অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গড়েছে এই সভ্যতা। একটা ভাইরাস এতো সহজে এটা শেষ করতে পারবে না। করোনা হলো একটি ভাইরাস ফ্যামিলির নাম। ‘‘করোনা’’ আসলে নির্দিষ্ট কোন ভাইরাস স্ট্রেইনের নাম নয়। এটি ভাইরাসের অনেকগুলো ফ্যামিলি বা গোষ্ঠীর মধ্যে একটি ফ্যামিলি। এই বিশাল ফ্যামিলির সকল স্ট্রেইনই চলমান মৃত্যু আতঙ্কের কারণ নয়।

শুধুমাত্র উপরোক্ত COVID-19 বা Novel Corona Virus দিয়ে COVID-19 রোগটি সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- স্ট্রেইনটি চীনের উহান অঞ্চলের বন্যপ্রাণির বাজার থেকে সাপ, বাঁদুর অথবা প্যাঙ্গোলিন (আঁশ যুক্ত এক ধরনের স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণি) থেকে মানুষকে আক্রান্ত করেছে এই ভাইরাস। চীনের বাজারের এসব বন্যপ্রাণী সেখানকার মানুষ ভক্ষণ করে থাকেন।

তবে এই নোভেল করোনা ভাইরাস ছাড়াও ইতোপূর্বে আরো দুই ধরনের করোনা ভাইরাস মানুষের রোগ সৃষ্টি করেছিলো। একটি হলো MERS CoV যা এসেছিলো আরব দেশের এক প্রজাতির উট (DromedaryCamel) হতে। আরেকটি হলো SARS CoV যা Civet cat নামক একধরণের বন্যপ্রাণী থেকে এসেছিলো। অনেক প্রজাতির করোনা ভাইরাসের মধ্যে যে ৭ টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পরে তার একটি নোভেল করোনা ভাইরাস।

যেভাবে ছড়ায় করোনা ভাইরাস-

করোনা একটা ছোয়াচে রোগ। বিশ্ব সংস্থা বলেছে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে গেলে যেকোন সুস্থ লোকই সংক্রামিত হতে পারে ।একজন ভাইরাস সংক্রামিত ব্যক্তির থেকে কতজন সংক্রামিত হবে তা নির্ভর করবে সেই ব্যক্তি ইনকিউবেশন পিরিয়ডের মধ্যে কতজন মেলামেশা করেছে তার উপর। ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি যতটা বেশি নিজেদের অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে ভাইরাস সংক্রমনের হারও ততটা কম থাকবে।

এ ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তির দেহে হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। কোন সুস্থ ব্যক্তি যখন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির দেওয়া হাঁচি বা কাশির সূক্ষকণার সংস্পর্শে আসে তখন তার দেহেও করোনা সংক্রমণ ছড়াতে পারে । তাই করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে নূন্যতম ১মি. বা ৩ ফিট দূরত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়। এ ভাইরাস বাতাসেও ছড়াতে পারে তবে সংক্রমিত ব্যক্তির স্পর্শের তুলনায় সংক্রমণের হার কম।

সংক্রমিত ব্যক্তির যদি লক্ষণ নাও থাকে তবে এ রোগ ছড়াতে পারে। তবে সংক্রমিত ব্যক্তির মলমূত্র থেকে এ রোগ ছড়ানোর হার তুলনামূলক কম। সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত সংস্পর্শে আসা টাকা বা বিভিন্ন নথিপত্রের মাধ্যমেও এ রোগ ছড়াতে পারে। এটা কাশির সিক্রেশন ড্রপলেট থেকে একমাত্র হাত অথবা মুখ, নাক ও চোখের মধ্য দিয়ে ৯৯ ভাগ সময়ে মানুষের শরীরে ঢোকে।

লক্ষ্মণ সমূহ –

এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষ্মণ দেখা দিতে ২-১৪ দিন সময় লাগে। সাধারণ ফ্লু বা সর্দি-জ্বরের সঙ্গে এর অনেক মিল পাওয়া যায়। সর্দি-কাশি, হালকা জ্বর ,শ্বাসকষ্ট, গলাব্যাথা,ও শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ। আক্রান্ত হবার পর প্রথম দিকে উপসর্গ খুবই কম থাকে, তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একই সাথে মাথাব্যাথা, শরীরব্যাথা ও পেটের সমস্যা থাকতে পারে।

যাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাল সপ্তাহখানেক পরে সর্দি ছাড়া অন্যান্য লক্ষণগুলো চলে যায়। কিন্তু ডায়বেটিস ও যে সকল রোগে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কম থাকে সে ক্ষেত্রে লক্ষণ সমূহ বাড়তে থাকে। কখনও কখনও এর পরিণামে নিউমোনিয়া ও শেষে মাল্টি অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যুও হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির কোন উপসর্গই থাকে না বা তারা অসুস্থ বোধ করেন না। প্রায় ৮০% আক্রান্ত মানুষই সেরকম কোন চিকিৎসা ছাড়াই সেরে ওঠেন।

করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে –

কোনো দেশে এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটার সময় প্রধানত চারটে পর্যায়ে ছড়ায়।

১. বিদেশ থেকে আগত রোগীর মাধ্যমে- যে সমস্ত দেশে আগেই সংক্রমণ ঘটেছে সেই অঞ্চল থেকে কেউ সংক্রমণের শিকার হয়ে নিজের দেশে ফিরলে, তাকে প্রথম পর্যায়ের সংক্রমণ বলা হয়।

২. আঞ্চলিক সংক্রমণ- বিদেশ থেকে আগত রোগীর সান্নিধ্যে এসে কেউ নিজে সংক্রামিত হলে তাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ বলা হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, একজন আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে অন্য সুস্থ মানুষের সংক্রমণের সম্ভাবনা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা, যাতে সংক্রমণের শৃঙ্খলটাকে কেটে দেওয়া যায়। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এখন এই পর্যায়ে আছে এবং সকলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে তবেই সংক্রমণ এই পর্যায়ে রোখা যাবে।

৩. পারস্পরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংক্রমণ- বিদেশ থেকে আগত রোগীর বা যেকোন করোনা আক্রান্ত রোগীর সান্নিধ্যে না এসেও কেউ যখন সংক্রামিত হয় তখন তাকে তৃতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ বলা হয়। এই পর্যায়ের সংক্রমণ অনেক দ্রুত, অনেক বড় এলাকা জুড়ে হয়।

৪. মহামারী- এটা শেষ এবং সবথেকে খারাপ পর্যায় যখন সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এই পর্যায়ের সংক্রমণ একবার হয়ে গেলে কবে, কিভাবে আটকানো যাবে, তা বলা অসম্ভব। এখন পযর্ন্ত প্রাপ্ততত্ত্যের ভিত্তিতে দেখা যায় নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে করোনার সংক্রমণ বেশি থাকে- যাদের বয়স ৬০ বা তার বেশি। যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কম।

যেমন- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্যান্সার রোগী, দীর্ঘমেয়াদী স্টেরয়েড যারা ব্যবহার করেন এমন রোগী। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, তীব্রতর এজ্যামা বা হাপানি, হার্ট ফেলিওর, কিডনী ফেলিওর, লিভার ফেলিওরের রোগী অতিরিক্ত ওজন যাদের বিএমআই (BMI) ৪০ এর বেশি গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রেও যেকোন ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে। প্রতিরোধে করনীয়- সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। সব রকমের ভিড় এখন পরিহার করতে হবে।

প্রতিরোধে করনীয় –

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। সব রকমের ভিড় এখন পরিহার করতে হবে। ঘনঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধুবেন( অন্তত ২০ সেকেন্ড)। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না। ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। কাশি শিষ্টাচার মেনে চলুন (হাচি, কাশির সময় বাহু / টিস্যু / কাপড় দিয়ে নাক মুখ ঢেকে রাখুন) মাছ মাংস ভালোভাবে রান্না করে খাবে।

ব্যক্তিগত সচেতনতা – অসুস্থ হলে ঘরে থাকুন, বাইরে যাওয়া অত্যাবশ্যক হলে নাক- মুখ ঢাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করুন জরুরী প্রয়োজন ব্যতীত ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন গরম চা, গরম কফি, গরম জল 1/2 ঘন্টা অন্তর খেতে পারলে ভালো। গলার মধ্যে কিছু জমে আছে এমন মনেহলে গরম জল + লবণ অথবা Betadine জাতীয় gargle ব্যাবহার করা দরকার।

ভালোভাবে ধুয়ে ভিটামিন – C যুক্ত ফল বেশী খেলে ভালো। বাইরে থেকে আনা বিস্কুট, কেক ইত্যাদির যেকোনো প্যাকেট ব্যবহার এর আগে ধুয়ে নিতে হবে। ঘরের ভিতরে ঝাড়ু দেয়া যাবেনা। বরং সরাসরি lizol জাতীয় floor cleaner দিয়ে মুছে ফেলতে হবে যাতে ধুলো উড়তে দেয়া যাবে না। বাজারে / বাইরে ব্যাবহৃত জুতা ঘরের বাইরেই রাখতে হবে। কাজের লোক, বাইরের যেকোনো লোক ঘরে আসতে চাইলে সরাসরি না বলুন।

কোনো খরব জানতে online এ জানুন। শুধুমাত্র ঘরে রান্না করা খাবার খান। ঠান্ডা খাবার / পানীয় সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করুন। ঘর থেকে একদম না বের হওয়া। অত্যাবশ্যকীয় ভ্রমণে সাবধানতা অবলম্বন করুন। সন্দেভাজন রোগীর ক্ষেত্রে করনীয়- অসুস্থ রোগীকে ঘরে থাকতে বলুন। মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে যেতে বলুন।

রোগীর নাম, বয়স, যোগাযোগ এর পূর্ণ ঠিকানা মোবাইল নাম্বার সংরক্ষণকরুন এবং আইইডিসিআর এর করোনা কন্ট্রোল রুমে (০১৭০০-৭০৫৭৩৭) আথবা হটলাইন নাম্বারে (০১৯২৭-৭১১৭৮৫, ০১ ৯৩৭-১১০০১১, ০১৯৩৭-০০০০১১) যোগাযোগ করুন।

লেখক-

চিকিৎসক

এ্যানেসথেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার বিভাগ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *